| শিক্ষা প্রতিবেদন |
|
শিক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদনঃ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এর ভারপ্রাপ্ত সচিব মহোদয়ের এর নিকট জেলা প্রশাসক, নওগাঁ কর্তৃক দেয়া এক উপানুষ্ঠানিকপত্র
আপনি অবগত আছেন যে ১১ টি উপজেলা অধ্যুষিত নওগাঁ জেলা রাজশাহী বিভাগের ৩৪৩৫ বর্গ কিলোমিটারের ২য় বৃহত্তম জেলা। এ জেলায় ১৪১৮ (প্রাথমিক ৭৯৪+রেজিঃ ৫৮৪+ কমিউনিটি ৪০) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক মান উন্নয়নে জরুরী পদক্ষপ গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করি।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিবিধ টানাপোড়ন ও মনুষ্য সৃষ্ট সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার যুগপৎ আক্রমনে নওগাঁর প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান সমেত্মাষজনক নয়। জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার বৎসরাধিক কাল এ আংগিনায় সরব পদচারনায় লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে এ জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার সনাক্তকৃত সমস্যা ও অব্যবস্থা চিত্র তুলে ধরছিঃ
১। সঠিক মাপ-মানের ও দন্ডে জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করা। ২। সিংহভাগ ক্ষত্রে বিদ্যালয় শুরম্নর পূর্বে অধিবেশন (এসেমবলী) অনুষ্ঠান না হওয়া। ৩। কোন কোন ক্ষত্রে এসেম্বলী হলেও জাতীয় সংগীত পুরোটা পরিবেশিত না হওয়া। ৪। শিক্ষক / শিক্ষিকা স্থানীয় বিধায় তাদের উপর এ টি ও দের কোন প্রশাসনিক প্রভাব না থাকা। ৫। নিয়মিত ক্লাস না হওয়া । ৬। পাঠদানে শিক্ষক/ শিক্ষিকাদের উদ্ভাবনীমূলক প্রচেষ্ঠা ও আমত্মরিকতা না থাকা। ৭। বিদ্যালয় সময়কালীন ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে ছাত্র, ছাত্রীদের কোচিং এ অংশগ্রহণ। ৮। বিদ্যালয়ের চিত্ত বিনোদন ও খেলাধূলার সামগ্রীর অভাব। ৯। জেলার এটিওদের ১৪টি পদ প্রায় ০২(দুই) বৎসর যাবৎ শূন্য থাকায় ( প্রায় ৩৫%) মাঠ পর্যায়ে ক্লাস্টার প্রশিক্ষণ ও বিদ্যালয় পরিদর্শন কার্যক্রম বাধাগ্রসহ হচ্ছে। ফলে ঝড়ে পড়া প্রতিরোধসহ শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বহুলাংশে সম্ভব হচ্ছে না বলে প্রতীয়মান ১০। SMC ‘র (বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি) সঠিক দায়িত্ব পালন না করা । ১১। রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে প্রধান শিক্ষকের পদের সংসহান না থাকা। ১২। জেলার বরেন্দ্র এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপ সমূহ শুষ্ক মৌসুমে বিকল থাকা। ১৩। উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অধীনে না থাকা । মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে নওগাঁ জেলা প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত / গৃহীতব্য পদক্ষপ নিমণরূপঃ-
১। জেলা প্রশাসনের পৃষ্টপোষকতা ও ব্যবস্থাপনায় অর্থের সংস্থান করে সঠিক মাপ, রঙ ও স্টীলের দন্ডে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩১/১২/২০০৯ এর ভেতর শতভাগ কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে। ২। নিয়মিত অধিবেশন অনুষ্ঠান ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৩। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য নেইল কাটার সরবরাহ করে অধিবেশন চলাকালে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যা অক্টোবর, ২০০৯ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে। ৪। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় আংগিনা পরিস্কার করণ ও বৃক্ষর চারা রোপনে হাতে কলমে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন থেকে ভর্তুকী দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নামমাত্র মূল্যে গাছের চারা সরবরাহ করা হয়েছে। ৫। স্কুল চলাকালীন প্রাইভেট কোচিং বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ৬। শিক্ষক/ শিক্ষিকাদের পাঠদানে মনোযোগী করতে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৭। জেলার বরেন্দ্র এলাকায় ২৬১টি অকেজো নলকূপ জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভার সিদ্ধামত্ম অনুসারে কার্যক্রম করা হয়েছে। ৮। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের আহবান ও উদ্যোগের ফলশ্রম্নতিতে মাননীয় সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান , ভাইস চেয়ারম্যান, ইউ, পি চেয়ারম্যান ও উপজেলার বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাগণ বিদ্যালয় দর্শন / পরিদর্শন করছেন। ৯। নিয়মিত যাতে ক্লাস হয় সেজন্য ‘Local Demand Create’ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তৃনমুল পর্যায়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রেস, রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে মানসম্মত শিক্ষা বিষয়ে নিয়মিত মত বিনিময় ও প্রচারনা চালানো হচ্ছে। ১০। জেলা প্রশাসনের অর্থায়নে পরিদর্শন/দর্শনকৃত বিদ্যালয়ে খেলাধুলার সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ‘বাগাডুলীর’ সাথে পরিচিত নয়। অথচ এটি যোগ-বিয়োগ শিখনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ১১। সকলকে সম্পৃক্ত করে প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করতে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে।
আমি আশাবাদী যে, বর্ণিত পদক্ষেপগুলো নওগাঁ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে চলমান গতিকে আরো বেগবান করবে। উপরন্ত গতানুগতিকতার খোলস থেকে বেরিয়ে এসে নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করি। সুপারিশ/প্রস্তাবনাসমূহ নিম্নরুপঃ
১। সম্মানিত জনপ্রতিনিধিদের অধিকতর মনোযোগ আকর্ষণ যাতে কর্ম এলাকায় শিক্ষক/শিক্ষিকা, অভিভাবকবৃন্দ উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসারদের জবাবদিহিতার নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। ২। উপজেলা শিক্ষক-শিক্ষিকা বদলীর বিষয়টি উপজেলার পরিবর্তে জেলায় ন্যাস্ত করা যেতে পারে। ৩। বিভাগীয় শৃংখলা ব্যবসহা কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করে ভাল শিক্ষক/শিক্ষিকাদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। ৪। জেলায় এটিওদের ১৪টি শূন্য পদ দ্রম্নত পূরণের ব্যবসহা । এতে মনিটরিং ও ফলো আপ জোরদার হবে। উপরন্ত ড্রপ আউটের সংখ্যাও অনেক কমে যাবে। ৫। পদবীর ক্ষেত্রে ‘‘উপজেলা শিক্ষা অফিসার’’ এর পরিবর্তে ‘‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার’’ করা হলে তা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত হবে। ৬। ২০১০-২০১১ বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের খেলাধূলার সামগ্রী সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। ৭। এসএমসি যাতে সত্যিকার অর্থে ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্য পুরস্কার/স্বীকৃতি ও সম্মানীর ব্যবসহা রাখা যেতে পারে। ৮। রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলমেব প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ও পদায়ন। ৯। উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের উপর ন্যস্ত করণসহ কমিটি পুনর্গঠন। ১০। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তি বিকাশে জেলায় দর্শনীয় স্থানসমূহ ভ্রমণ ও পরিদর্শনের ব্যবসহা করা যেতে পারে। ১১। কবিতা, রচনা, আবৃত্তি, বনভোজন, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ এগুলো নিয়মিত আয়োজন করা যেতে পারে। ১২। রিপোর্ট/রিটার্ণ এর সংখ্যা কমিয়ে আনাসহ শিক্ষিকদের বিবিধ এসাইনমেন্টের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা পাঠদানে ১০০% মনোযোগী হতে পারেন। জেলার ৩ (তিন) ধরণের ১৪১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীদের মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্ণিত প্রস্তাবনাগুলো সদয় বিবেচনার জন্য সবিনয় অনুরোধ রইলো।
সবাইকে নিয়ে শিক্ষার এ গুরুত্বপূর্ণ ভিতকে গুনগতভাবে শক্তিশালী, সমুন্নত ও টেকসই করতে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের দৃঢ় প্রত্যয় ও অংগীকার ব্যক্ত করছি।
|